পড়াশোনার কোনো বয়স নেই: দেরিতে শুরু করলেও সফল হওয়া কি সম্ভব?
পড়াশোনার কোনো বয়স নেই। দেরিতে শুরু করলেও ইচ্ছা ও সুযোগ থাকলে জীবন বদলানো সম্ভব। উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের নতুন পথ দেখাতে পারে, তা নিয়েই এই লেখা।
পড়াশোনার কোনো বয়স নেই: দেরিতে শুরু করলেও সফল হওয়া কি সম্ভব?
অনেক মানুষই জীবনের শুরুতে পড়াশোনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চান না বা সেটা অনেকে বুঝেন না বা কেহ আবার আর্থিুক সমস্যার কারনে হয়ে উঠে না। তখন মনে হয়, আগে কাজ করি, আগে সংসার দেখি, বা টাকা থাকলে শিক্ষা লাগেনা, মনকে নানান ভাবে বুঝায় এক কথায় বলা যায়( অভাবে পরলে সভাব নস্ট) বা পরে পড়াশোনা করা যাবে। আবার কেউ কেউ পারিবারিক সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে মাঝপথেই পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু সময় যতই গড়াতে থাকে, একসময় মনে প্রশ্ন জাগে—
“আহা, যদি তখন পড়াশোনা করতাম, আজ হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতো।”
এই অনুভূতিটা খুব স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন দেখা যায়, নিজের বয়সী বা নিজের চেয়ে ছোট কেউ ভালো চাকরি করছে, সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে আছে কিংবা জীবনে এগিয়ে গেছে। তখন মনে হয়, আমরা হয়তো সময়টাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি।
বয়স কি সত্যিই পড়াশোনার পথে বাধা?
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে গেলে আর পড়াশোনা করা যায় না। অনেকেই মনে করেন,
“এখন পড়তে বসলে লোকে কী বলবে?”
“আমার জুনিয়ররাই তো এখন অনেক এগিয়ে গেছে, তারা আমাকে ছোট করে দেখবে না তো?”
এই চিন্তাগুলো বাস্তবে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। কারণ এগুলো বাস্তব বাধা নয়, বরং মানসিক ভয়। সত্যি কথা হলো, পড়াশোনার কোনো বয়সসীমা নেই। শেখার আগ্রহ থাকলে যেকোনো সময়ই শুরু করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা ৩০, ৪০ এমনকি ৫০ বছর বয়সেও নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে সফল হয়েছেন।
নিজের ভয়ই সবচেয়ে বড় বাধা
অনেক সময় আমরা ভাবি, সমাজ আমাদের কীভাবে দেখবে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ খুব অল্প সময়ই অন্যকে নিয়ে ভাবে। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে। কারণ সময় যেভাবেই হোক চলে যাবে। পাঁচ বছর পর আপনি যদি আজকের মতোই থাকেন, তখন আফসোস আরও বাড়বে।
আজ যদি আপনি সিদ্ধান্ত নেন, পড়াশোনা আবার শুরু করবেন—এই সিদ্ধান্তটাই আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সবার জন্য উন্মুক্ত ও সম্মানজনক শিক্ষা ব্যবস্থা কেন জরুরি?
এই মানসিক দ্বিধাগুলোর একটি বড় সমাধান হলো—সবার জন্য উন্মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা। এমন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, যেখানে বয়স কোনো বাধা হবে না। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীও সম্মানের সাথে পড়াশোনা করতে পারবে, লজ্জা বা ভয় ছাড়াই।
বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (BOU)। এখানে বয়স কোনো সমস্যা নয়। যাঁরা নিয়মিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়েছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
তবে বাস্তবতার কথা বলতে গেলে, এই ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশের সব জায়গায় এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পৌঁছায়নি। অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান ও পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা যায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো খরচ। অনেক সময় শিক্ষার্থীদের একসাথে পুরো ফি পরিশোধ করতে হয়, যা অনেকের জন্য কষ্টকর। কিস্তিভিত্তিক বা সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হলে, আরও বেশি মানুষ এই সুযোগ নিতে পারত।
দেরিতে শুরু করলেও সফল হওয়া সম্ভব
পড়াশোনা মানেই শুধু সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাভাবনা বদলায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায় এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। শুরুতে হয়তো সময় ম্যানেজ করা কঠিন হবে, কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালানো কষ্টকর মনে হবে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অভ্যাসটাই শক্তিতে পরিণত হয়।
আজকের যুগে অনলাইন কোর্স, ওপেন ইউনিভার্সিটি এবং পার্ট-টাইম শিক্ষার সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। দরকার শুধু সিদ্ধান্ত এবং ধৈর্য।
শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়
পড়াশোনার উদ্দেশ্য কেবল নিজের উন্নতি নয়, বরং একটি শিক্ষিত ও সুস্থ জাতি গড়ে তোলা। যখন মানুষ প্রফেশনালভাবে লেখাপড়া করে, তখন তার আচরণ, চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসে। একজন শিক্ষিত মানুষ সমাজের সামনে একটি সুন্দর ও ইতিবাচক চিত্র উপহার দিতে পারে।
কেউ যদি তাকে তিরস্কারও করে, সে তখন বুঝতে পারে—
শিক্ষার পথটাই সঠিক ছিল।
কারণ শিক্ষা মানুষকে ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মসম্মান শেখায়।
ভুল ধারণা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে কিছু মানুষ মনে করে—
যদি কেউ বেশি পড়াশোনা করে, তাহলে সে অন্যের চাকরি বা কাজ কেড়ে নেবে।
এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
আসলে একজন শিক্ষিত মানুষ কখনোই অন্যের ক্ষতি করার কথা ভাবে না। বরং কাউকে আঘাত করার আগে, কটু কথা বলার আগে সে ভাবে—
“তারও তো সম্মান আছে।”
এই মানবিক বোধটাই শিক্ষা আমাদের শেখায়। তাই আমাদের উচিত সবাইকে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া, একে অপরকে নিরুৎসাহিত না করা এবং কাউকে কটূক্তি না করা।
উপসংহার
পড়াশোনার কোনো বয়স নেই। সুযোগ ও ইচ্ছা থাকলে যেকোনো সময়েই জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। অতীত নিয়ে আফসোস না করে, আজ থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ আজকের একটি ছোট সিদ্ধান্তই আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
লেখক
মোঃ নাসির (ভার্সন বাংলা)
সকলকে কমেন্টের জন্য অনুরোধ । যানাবেন কার স্থানে কোন সুযোগ বেসি রয়েছে।